রাবি প্রতিনিধি: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (রাকসু) নির্বাচন আয়োজনের প্রক্রিয়া শুরু করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। পূর্বঘোষিত রোডম্যাপ অনুযায়ী, গঠনতন্ত্র সংশোধনের জন্য একটি খসড়া প্রকাশ করা হয়েছে।
গত ১৬ মার্চ প্রকাশিত এই খসড়া সংশোধনের জন্য শিক্ষকদের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের মতামত ও পরামর্শ চেয়ে ই-মেইল আহ্বান করা হয়েছে।
শেষ মুহূর্তে সংশোধনী দেওয়ার সুযোগ কাজে লাগিয়ে মতামত জানাতে ব্যস্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ক্রিয়াশীল ছাত্রসংগঠন। তবে সংশোধনী নিয়ে আলোচনা হলেও অধিকাংশ সংগঠন জোর দিচ্ছে রাকসু নির্বাচনের দ্রুত বাস্তবায়নের ওপর।
নুরুল হক নুরের রাজনৈতিক সংগঠন গণঅধিকার পরিষদের ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্র অধিকার পরিষদ, রাবি শাখা বলছে সভাপতির ক্ষমতার ভারসাম্য নিশ্চিত করে রাকসু বাস্তবায়ন চায় তাঁরা। গঠনতন্ত্র সংশোধন যতটুকুই হোক, দীর্ঘ ৩২ বছর পর রাকসু বাস্তবায়নকেই এক প্রকার চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন সংগঠনটির রাবি শাখার আহ্বায়ক মেহেদী হাসান মারুফ।
তিনি বলেন, এর আগে আমরা বলেছিলাম রাকসু যেহেতু ছাত্র সংসদ; অবশ্যই এখানে সকল প্রতিনিধি ছাত্রদের মধ্য থেকে নির্বাচিত হতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এখানে রেগুলেটরি বডি হিসেবে থাকতে পারে, কিন্তু তারা এখানে কোনো হস্তক্ষেপ করতে পারবে না। শিক্ষকদের সভাপতি কিংবা কোষাধ্যক্ষ পদে থাকার যৌক্তিকতা আমরা দেখিনা। তবে দীর্ঘ ৩২ বছর রাকসু বাস্তবায়ন না হওয়ায় সেটা বাস্তবায়ন হওয়ার একটা ব্যাপার আছে। তাই আমরা আপাতত ক্ষমতার ভারসাম্যের মাধ্যমে রাকসু বাস্তবায়ন চাই।
সভাপতির ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষার বিষয়ে তিনি বলেন, সভাপতিকে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে রাকসু’র কার্যকরী সদস্যের দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থন নিতে হবে এমনটা চাই আমরা। পাশাপাশি আমরা একটা কথা বলতে চাই রাকসু নির্বাচনের জন্য স্থায়ী ক্যালেন্ডার হোক।
এছাড়া নতুন পদ সংযুক্ত করার ব্যাপারে তিনি বলেন, আমরা পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক ও জুলাই স্মৃতি সংরক্ষণ বিষয়ক সম্পাদক পদ রাখার ব্যাপারে নতুন করে সুপারিশ করবো।
বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের আহ্বায়ক ফুয়াদ রাতুল অবশ্য বলছেন ভিন্ন কথা। পদাধিকার বলে উপাচার্যের সভাপতি হওয়াকে অগণতান্ত্রিক ধারা বলছেন তিনি।
তিনি বলেন, আমরা মনে করি রাকসু’র যে সর্বেসর্বা ক্ষমতা আছে, সেটা উপাচার্যের হাতে আছে; উনি পদাধিকার বলে রাকসু’র সভাপতি। এটা একটা অগণতান্ত্রিক ধারা। এই ধারা পরিবর্তন করা উচিত। আমরা মনে করি রাকসু’র সভাপতি ছাত্রদের মধ্যে থেকেই নির্বাচিত হোক।
এছাড়া তাঁরা নতুন করে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক সম্পাদক রাখার জন্যও সুপারিশ করবেন বলে জানান তিনি।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ও বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরও চায় রাকসু বাস্তবায়ন হোক। তবে সভাপতির ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা কিংবা গঠনতন্ত্রের সংশোধনী বিষয়ে কৌশলী উত্তর দিয়েছেন তারা। তবে নারীদের জন্য আলাদা করে ভিপি, জিএস, এজিএস পদ রাখার দাবির কথা বলছে ছাত্রদল।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল, রাবি শাখার আহবায়ক সুলতান আহমেদ রাহী বলেন, আমরা চাই সংস্কার সময় উপযোগী ও আধুনিক হোক, যা শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে পারবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিজে অনির্বাচিত হয়ে একক ভাবে ক্ষমতায়ন, যা ২৪ এর জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের শহিদদের স্পিরিট এর সাথে যায় না।
তিনি আরো বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ শিক্ষার্থী নারী। তাদের কে রাজনৈতিক ভাবে এবং শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ের জন্য কাজ করার সুযোগ পরিবেশ তৈরি করে দিতে হবে তাই নারী ভিপি , জিএস এজিএস , নতুন কিছু পদ সহ বিভিন্ন সংশোধনী দিবো আমরা। খুব শীগ্রই আনুষ্ঠানিক ভাবে আমরা জানাবো।
সুস্পষ্ট প্রস্তাবনা রয়েছে ছাত্রশিবিরেরও। শিক্ষার্থীদের অধিকার রক্ষা ও ক্যাম্পাসের সুষ্ঠু পরিবেশ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে রাকসু চায় ছাত্রশিবির। এজন্য সংগঠনের পক্ষ থেকে প্রশাসনকে যথাসম্ভব সহযোগিতা করার আশ্বাস দিচ্ছেন তারা।
বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির, রাবি শাখার সাধারণ সম্পাদক মুজাহিদ ফয়সাল বলেন,
আমরা আগে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে গঠনতন্ত্র সংস্কারের জন্য একটি প্রস্তাবনা জমা দিয়েছিলাম। প্রশাসন সবার পরামর্শের ভিত্তিতে সংশোধিত গঠনতন্ত্র প্রকাশ করেছে। তবে, বর্তমান সংশোধিত গঠনতন্ত্রের বিষয়ে আমাদের আরও কিছু সুস্পষ্ট প্রস্তাবনা রয়েছে। আমরা নিয়ম অনুযায়ী সেগুলো পুনরায় প্রশাসনের কাছে উত্থাপন করবো।
তিনি আরো বলেন, রাকসু নিয়ে আমাদের স্পষ্ট অবস্থান হলো—শিক্ষার্থীদের অধিকার রক্ষা ও ক্যাম্পাসের সুষ্ঠু পরিবেশ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আমরা রাকসু চাই। রাকসুর বিষয়ে আমাদের সংগঠনের পক্ষ থেকে প্রশাসনকে যথাসম্ভব সহযোগিতা করে যাবো।
সার্বিক বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর সালেহ হাসান নকীব বলেন, তাদের তো সুযোগ আছেই, গঠনতন্ত্র চূড়ান্ত করারই আগে তারা পরামর্শ দিবেই। তারপর আমরা গঠনতন্ত্র চূড়ান্ত করবো। এর আগেও আমরা সবার মতামত নেওয়ার চেষ্টা করেছি।
উল্লেখ্য, গত ১৬ মার্চ প্রকাশিত খসড়া গঠনতন্ত্র অনুযায়ী পদাধিকার বলে রাকসু’র সভাপতি হবেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য। সভাপতি চাইলে রাকসু’র যে কারো পদ স্থগিত করতে পারবেন কিংবা পুরো সংসদকে স্থগিত করতে পারবেন। এছাড়া সংসদে গৃহীত কোন সিদ্ধান্ত সভাপতির অনুমতি ব্যাতীত বাস্তবায়ন হবেনা।
২৫ সদস্যবিশিষ্ট কার্যকরী পরিষদে সভাপতি, কোষাধ্যক্ষ, সহ-সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক, সহকারী সাধারণ সম্পাদক ছাড়াও ক্রীড়া সম্পাদক, সংস্কৃতি সম্পাদক,নারী বিষয়ক সম্পাদক, তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক , মিডিয়া ও প্রকাশনা সম্পাদক, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পাদক বিতর্ক ও সাহিত্য সম্পাদক, সমাজকল্যাণ সম্পাদকের পদ রয়েছে। প্রত্যেক সম্পাদকের একজন সহকারী ও ৪ জন কার্যনির্বাহী সদস্যের পদ রাখা হয়েছে।
jk/h
মন্তব্য